Dhaka 9:33 pm, Wednesday, 18 February 2026

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছড়িয়ে পড়ছে

  • Reporter Name
  • Update Time : 12:52:23 pm, Wednesday, 10 September 2025
  • 75 Time View

বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে সম্পদের মানে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। পাশাপাশি সম্পদ বাড়ার হার কমেছে। ঋণ আদায় কম হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
এর বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে। খেলাপি ঋণ আগে কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ছিল। এখন তা সব ব্যাংকেই ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি দুই খাতেই লাভ কমেছে।
ফলে খাত দুটিকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোতে হচ্ছে। আগামীতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। প্রভিশন সংরক্ষণের হারও কমে যাবে।
তখন মূলধনও হ্রাস পাবে। আগে লুটপাটের শিকার ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণ বেশি মাত্রায় বেড়েছিল। এখন এটি ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রৈমাসিক ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, জানুয়ারি-মার্চ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ব্যাংকগুলোতে সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার বেশ কমেছে। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে সম্পদ বেড়েছিল ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেড়েছে ২.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ সম্পদ বাড়ার হার প্রায় অর্ধেক কমেছে। এদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ও প্রভিশন রাখার হার কমায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সম্পদের মান কমায় ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। আগামীতে সম্পদের মান আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যাবে। এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার আরও কমে যাবে।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এখন লুটের সব ঋণই খেলাপি হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যাংক খাতে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশে। ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার ডিসেম্বরে ছিল ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৯৭ শতাংশে। ব্যাংকগুলো মুনাফা অর্জনের দিক থেকে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। গত মার্চে সম্পদ থেকে আয় ও মূলধন থেকে আয় দুই খাতেই লোকসান হয়েছে। সম্পদ থেকে লোকসান হয়েছে দশমিক ১৮ শতাংশ এবং মূলধন থেকে লোকসান হয়েছে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে দুই খাতেই মুনাফা ছিল।

গত মার্চ পর্যন্ত কিছু ব্যাংকের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ মূলধনে রূপান্তর করায় মূলধন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত ডিসেম্বরে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন ছিল ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মার্চে তা কিছুটা বেড়ে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানে যেভাবে অবনতি হচ্ছে, তাতে আগামীতে ব্যাংকগুলো আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কারণ ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। শীর্ষ দুই ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে। জামানতের পরিমাণ কমে যাবে। এতে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। তখন মূলধন সংরক্ষণের হার আরও কমে ৩ দশমকি ৩৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ ছিল শীর্ষ ৫ ব্যাংকে। গত মার্চে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে ছিল ৭৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা কমে এখন সব ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ শতাংশের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ২৬টি ব্যাংকের। গত মার্চে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে। অর্থাৎ ১১টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের ওপর চলে গেছে। ৫ শতাংশের বেশি থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ডিসেম্বরে ছিল ১৬টি ব্যাংকে। গত মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩টি ব্যাংকে। ৫০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ আগে ছিল ৮টি ব্যাংকে। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০টি ব্যাংকে। এভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

About Author Information

সর্বাধিক পঠিত

ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ ছড়িয়ে পড়ছে

Update Time : 12:52:23 pm, Wednesday, 10 September 2025

বাণিজ্যিক ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোতে সম্পদের মানে বড় ধরনের অবনতি ঘটেছে। পাশাপাশি সম্পদ বাড়ার হার কমেছে। ঋণ আদায় কম হওয়ায় খেলাপি ঋণ বেড়েছে।
এর বিপরীতে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে। খেলাপি ঋণ আগে কয়েকটি ব্যাংকে কেন্দ্রীভূত ছিল। এখন তা সব ব্যাংকেই ছড়িয়ে পড়ছে। এতে সব ব্যাংকেই খেলাপি ঋণ বেড়ে যাচ্ছে। ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি দুই খাতেই লাভ কমেছে।
ফলে খাত দুটিকে নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এগোতে হচ্ছে। আগামীতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ আরও বাড়বে। প্রভিশন সংরক্ষণের হারও কমে যাবে।
তখন মূলধনও হ্রাস পাবে। আগে লুটপাটের শিকার ব্যাংকগুলোতেই খেলাপি ঋণ বেশি মাত্রায় বেড়েছিল। এখন এটি ব্যাংক খাতে ছড়িয়ে পড়ছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ত্রৈমাসিক ‘আর্থিক স্থিতিশীলতা মূল্যায়ন প্রতিবেদন, জানুয়ারি-মার্চ ২০২৫’ শীর্ষক প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে গত মার্চ পর্যন্ত ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানিগুলোর সার্বিক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, জানুয়ারি থেকে মার্চ সময়ে ব্যাংকগুলোতে সম্পদের পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও আগের প্রান্তিকের তুলনায় প্রবৃদ্ধির হার বেশ কমেছে। গত অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে ব্যাংক খাতে সম্পদ বেড়েছিল ৪ দশমিক ১৯ শতাংশ। গত জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে বেড়েছে ২.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ সম্পদ বাড়ার হার প্রায় অর্ধেক কমেছে। এদিকে খেলাপি ঋণ বাড়ায় ও প্রভিশন রাখার হার কমায় ব্যাংকগুলোর সম্পদের মান আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সম্পদের মান কমায় ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। আগামীতে সম্পদের মান আরও কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ আরও বেড়ে যাবে। এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার আরও কমে যাবে।

সূত্র জানায়, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ব্যাংক খাতে নজিরবিহীন লুটপাট হয়েছে। এখন লুটের সব ঋণই খেলাপি হচ্ছে। এ কারণে ব্যাংকগুলোর আয় কমে যাচ্ছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে ব্যাংক খাতে।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ২০ দশমিক ২০ শতাংশ। মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ১৩ শতাংশে। ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণের হার ডিসেম্বরে ছিল ৫০ দশমিক ৭৫ শতাংশ। গত মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৯৭ শতাংশে। ব্যাংকগুলো মুনাফা অর্জনের দিক থেকে ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়েছে। গত মার্চে সম্পদ থেকে আয় ও মূলধন থেকে আয় দুই খাতেই লোকসান হয়েছে। সম্পদ থেকে লোকসান হয়েছে দশমিক ১৮ শতাংশ এবং মূলধন থেকে লোকসান হয়েছে ৩ দশমিক ৯৯ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে দুই খাতেই মুনাফা ছিল।

গত মার্চ পর্যন্ত কিছু ব্যাংকের অর্জিত মুনাফার একটি অংশ মূলধনে রূপান্তর করায় মূলধন পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। গত ডিসেম্বরে ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদের বিপরীতে মূলধন ছিল ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ। মার্চে তা কিছুটা বেড়ে ৬ দশমিক ৭৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকগুলোর সম্পদের মানে যেভাবে অবনতি হচ্ছে, তাতে আগামীতে ব্যাংকগুলো আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। কারণ ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। শীর্ষ দুই ঋণগ্রহীতা খেলাপি হলে মূলধন পর্যাপ্ততার ওপর সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসবে। জামানতের পরিমাণ কমে যাবে। এতে ঝুঁকির মাত্রা আরও বেড়ে যাবে। তখন মূলধন সংরক্ষণের হার আরও কমে ৩ দশমকি ৩৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

প্রতিবেদন থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে ৫১ দশমিক ৬৫ শতাংশ ছিল শীর্ষ ৫ ব্যাংকে। গত মার্চে এসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৪৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ। গত ডিসেম্বরে মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে শীর্ষ ১০ ব্যাংকে ছিল ৭৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। গত মার্চে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭১ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ কেন্দ্রীভূত হওয়ার প্রবণতা কমে এখন সব ব্যাংকে ছড়িয়ে পড়ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫ শতাংশের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ২৬টি ব্যাংকের। গত মার্চে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৫টিতে। অর্থাৎ ১১টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৫ শতাংশের ওপর চলে গেছে। ৫ শতাংশের বেশি থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত খেলাপি ঋণ ডিসেম্বরে ছিল ১৬টি ব্যাংকে। গত মার্চে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩টি ব্যাংকে। ৫০ শতাংশের বেশি খেলাপি ঋণ আগে ছিল ৮টি ব্যাংকে। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০টি ব্যাংকে। এভাবে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রবাহ ছড়িয়ে পড়ছে।