নিয়মিতই সিলেটের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে ঘুরতে আসা পর্যটকদের প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। বেশিরভাগই মারা যাচ্ছেন পানিতে সাঁতার কাটতে নেমে। সর্বশেষ সোমবার দুপুরে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাদাপাথর থেকে জয় নামে এক পর্যটকরে মরদেগ উদ্ধার করা হয়। এরআগে গত শুক্রবার (২৫ আগস্ট) গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলং থেকে রমিজ উদ্দিন নামে আরেক পর্যটকদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
সোমবারের দুর্ঘটনার ব্যাপারে জানা যায়, সোমবার দুপুরে ঢাকার মগবাজার থেকে ভোলাগঞ্জ সাদাপাথরে বেড়াতে আসেন চার বন্ধু। এদের মধ্যে জয় গাইন (২৫) নামে একজন পানিতে ডুবে মারা যান।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হিল্লোল রায় জানান, জয় সাদাপাথরে গোসল করতে নেমেছিলেন। এ সময় পানির ¯্রােতে তিনি আর স্থির থাকতে পারেননি। মূহুর্তেই পানির নিচে তলিয়ে যান। প্রায় ১৫ মিনিট পর স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করেন। এরপর তাকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার মৃত ঘোষণা করেন।
সিলেটের জাফলং, সাদাপাথর, বিছানাকান্দি, লালাখালে বেড়াতে এসে প্রয়াশই পানিতে ডুবে মারা যান পর্যটকরা। বর্ষা মৌসুমে নদীতে পানি ও ¯্রােত বাড়ায় এ সময় নিহতের সংখ্যাও বাড়ে।
গত ৬ জুলাই জাফলংয়ের পিয়াইন নদে বাবার সঙ্গে গোসলে নেমে নিখোঁজ হয় ঢাকার রেসিডেনসিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র মো. আল ওয়াজ আরশ। ৮ জুলাই সকাল সাতটার দিকে ঘটনাস্থলের পার্শ্ববর্তী স্থানে আল ওয়াজ আরশের লাশ ভেসে ওঠে। এর আগে ১ জুলাই কোম্পানীগঞ্জের সাদাপাথর পর্যটনকেন্দ্রে আবদুস সালাম (২৩) নামের এক তরুণ গোসলে নেমে নিখোঁজ হয়েছিলেন। ওই ঘটনার দুই দিন পর ৩ জুলাই আবদুস সালামেরও লাশ ভেসে উঠেছিল।
বারবার এমন মৃত্যুর জন্য সংশ্লিস্টরা পর্যটকদের সচেতনার অভাবকে দায়ী করেছেন। অপরদিকে পর্যটকদের অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতায়ই প্রাণহানি বাড়ছে।
পর্যটন পুলিশ, থানা পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিলেটের সবচেয়ে আকর্ষনীয় পর্যটন কেন্দ্র জাফলং। মেঘালয় পাঁহাড়ঘেষা জাফলংয়ের নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে পাথর ও বালু উত্তোলনের ফলে অনেক স্থান মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। গত দুই দশকে জাফলংয়ে বেড়াতে এসে মারা গেছেন ৬০ জন পর্যটক।
অন্যদিকে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তঘেঁষা ধলাই নদের সাদা পাথর পর্যটকদের কাছে পরিচিতিই পেয়েছে ৫-৬ বছর আগে। যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো হওয়ায় এখন প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক পর্যটক আসেন সাদা পাথরে। তবে এই ৫/৬ বছরেই এখানে মারা গেছেন ১২ পর্যটক। এ ছাড়া গোয়াইঘাট এলাকার পাথুরে নদীর আরেক পর্যটনকেন্দ্র বিছনাকান্দিতে এই সময়ে মারা গেছেন চারজন।
সংশ্লিস্টরা বলছেন, বর্ষায় নদীর তীব্র ¯্রােত, চোরাবালি, নৌকাডুবি ও সাঁতার না জানার কারণে পানিতে ডুবে মারা যাচ্ছেন পর্যটকরা।
পর্যটকদের নিরাপত্তায় গাইডলাইন না থাকা এবং তাদের সচেতনতায় তেমন কোন উদ্যোগ না থাকায় দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি বাড়ছে বলেও অভিযোগ ওঠেছে।
সিলেট চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি তাহমিন আহমদ বলেন, কয়েকটি সাইনবোর্ড টানানো ছাড়া সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের নিরাপত্তায় আর কোন উদ্যোগ নেই। পর্যটনকেন্দ্রে টুরিস্ট পুলিশ বা স্বেচ্ছাসেবক নেই। ফলে পর্যটকরা ইচ্ছেমত ঘুরাফেরা করেন। কেউ তাদের বাধা দেন না।
জানা গেছে, সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণে একক কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের উন্নয়নসহ নানা দিক দেখাশোনা করে। তাদের পক্ষে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্রগুলো পরিচালনা করছে পর্যটন উন্নয়ন কমিটি। এর সভাপতি জেলা প্রশাসক। এ কমিটিতে স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারাও রয়েছেন। উপজেলা প্রশাসন থেকে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে কিছু স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং লাইফ
জ্যাকেটের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। আর পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকটকের নিরপত্তার দিকটি মূলত পর্যটন পুলিশ দেখভাল করে। তবে তাদেরও রয়েছে লোকবল সঙ্কট।
জাফলং ও বিছানাকান্দি পর্যটনকেন্দ্রের অবস্থান গোয়াইনঘাট উপজেলায়। এই দুই স্থানে পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাহমিলুর রহমান বলেন, উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার পর্যটনকেন্দ্রে সতর্কতামূলক বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছিল। তবে বন্যার পানিতে সেগুলো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, পর্যটকদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু মানুষের মধ্যে এসব নিষেধাজ্ঞা শোনার প্রবণতা কম থাকে। ¯্রােতের পানিতে না নামার পাশাপাশি পানিতে নামলে লাইফ জ্যাকেট পরার দিকে নজর রাখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
সাদা পাথরে পর্যটকদের নিরাপত্তা পসঙ্গে কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও লুসিকান্ত হাজং বলেন, বর্ষা মৌসুমে হ্যান্ডমাইক নিয়ে দুজন স্বেচ্ছাসেবী সার্বক্ষণিক পর্যটনকেন্দ্রে থাকেন। তারা পর্যটকদের স্রোতের পানিতে না নামার আহ্বান জানান। নৌকার ঘাটে সাইনবোর্ড দিয়ে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পানিতে না নামতে নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। এরপরও মানুষ এগুলো শুনতে চান না। পর্যটকদের সতর্ক করার জন্য ঘাটে মাইক লাগানো এবং নৌকার টিকিটের পেছনে আরও কিছু নির্দেশনা দিয়ে প্রচারণা চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।
Reporter Name 









